ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। উপজেলার সংখ্যানুসারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা।

আয়তন ও অবস্থান [সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আয়তন ১৮৮১.২১ বর্গ কিলোমিটার (৪,৬৪,৮৫৬ একর)। চট্টগ্রাম বিভাগের সর্ব-উত্তরে ২৩°৩৯´ থেকে ২৪°১৬´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°৪৪´ থেকে ৯১°৫১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে এ জেলার অবস্থান। এ জেলার দক্ষিণে কুমিল্লা জেলা; পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ জেলা, নরসিংদী জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা; উত্তরে কিশোরগঞ্জ জেলা ও হবিগঞ্জ জেলা এবং পূর্বে হবিগঞ্জ জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ অবস্থিত।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রতিষ্ঠাকাল[সম্পাদনা]

এক সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের সমতট জনপদের একটি অংশ ছিল। ঈসা খাঁ বাংলায় প্রথম এবং অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেন সরাইলে। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা দেওয়ানী লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ত্রিপুরাকে দুইটি অংশে বিভক্ত করে। সেগুলি হলো ত্রিপুরা ও চাকলা রৌশনাবাদ। ১৭৮১ সালে সরাইল পরগনা ব্যতীত বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী নিয়ে একটি জেলা ইংরেজরা গঠন করে এবং এর নাম দেয় টিপারা (Tippera) জেলা বা ত্রিপুরা জেলা। ত্রিপুরা জেলার দুটি পরিচয় ছিল। সাধারণভাবে ত্রিপুরা জেলা বলতে সমগ্র জেলাকে আর টিপারা প্রপার বলতে চাকলা রৌশনাবাদকে বোঝাত। তবে ইংরেজরা এ জেলাকে রোশনাবাদ ত্রিপুরা বলত। ১৭৮৯ সালে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এটিকে ত্রিপুরা জেলা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৭৯০ সালে প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ ত্রিপুরা জেলা হিসাবে ঘোষিত হয়। ১৮৩০ সালে ছাগলনাইয়া (ফেনী জেলার অন্তর্গত) থানা ছাড়া বৃহত্তর নোয়াখালীর বাকী অংশ ত্রিপুরা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং ময়মনসিংহ থেকে সরাইল, দাউদপুর, হরিপুর, বেজরা ও সতেরখন্দল পরগনাকে ত্রিপুরায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়। ত্রিপুরার তিনটি সাব-ডিভিশন থেকে নাসিরনগর মহকুমা সৃষ্টি হয় ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ আইনে। ১১ বছর পর মহকুমা সদর নাসিরনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে স্থানান্তরিত হয়। মহকুমার নামকরণ করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ছয়টি থানা গঠিত হয়। যথা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল, নাসিরনগর, নবীনগর, কসবা ও বাঞ্ছারামপুর। ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।। ১৮৭৬ সালে ছাগলনাইয়া থানাও ত্রিপুরা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তারপর থেকে ১৯৬০ সালে পর্যন্ত এই জেলাটি ত্রিপুরা জেলা নামেই পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬০ সালে এক প্রশাসনিক আদেশে ত্রিপুরা জেলাকে কুমিল্লা জেলা নামে অভিহিত করা হয়। এরপর সুদীর্ঘ চব্বিশ বৎসর পর ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা

নামকরণ[সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। এস এম শাহনূর প্রণীত “নামকরণের ইতিকথা” থেকে জানা যায়, সেন বংশের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের বড়ই অভাব ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলে পূজা অর্চনার জন্য বিঘ্নতার সৃষ্টি হত। এ সমস্যা নিরসনের জন্য সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যকুঞ্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে কিছু ব্রাহ্মণ পরিবার শহরের মৌলভী পাড়ায় বাড়ী তৈরি করে। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ির অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অন্য একটি মতানুসারে দিল্লী থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফী হযরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহর থেকে উল্লেখিত ব্রাহ্মণ পরিবার সমূহকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন, যা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণ ‘বাউনবাইরা’। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিকৃত নাম ‘বি-বাড়িয়া’ বহুল প্রচলিত। যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে সকল ক্ষেত্রে বি-বাড়িয়ার পরিবর্তে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ লেখার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন[সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কেন্দ্র করে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে বিপ্লবী উল্লাস কর (অভিরাম) দত্ত কর্তৃক বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে সুনীতি চৌধুরী, শান্তি ঘোষ ও গোপাল দেব প্রকাশ্য দিবালোকে তদানিন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি.সি.বি স্টিভেনসকে তারই বাসগৃহে গুলি করে হত্যা করে। ১৯৩০ সালে কৃষক আন্দোলনের সময় কংগ্রেস নেতা আব্দুল হাকিম খাজনা বন্ধের আহ্বান জানান। এ সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের বেপরোয়া গুলিবর্ষণে চারজন বেসামরিক লোক নিহত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অবদান অনেক। আবদুল কুদ্দুস মাখনের মত ব্যক্তিরা এখানে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয় এবং এদিনই ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী জনগণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করেন । ২৭ মার্চ সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়োজিত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার কর্নেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম তার সাথের বাঙালি সেনাদের নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর্মি ক্যাম্পের সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যকে বন্দি করেন। ঐদিন দুপুরে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম মৌলভীবাজারের শমসেরনগর হতে তার সেনাদল নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল তার কাছে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানির দায়িত্ব অর্পণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে আখাউড়ার দরুইন গ্রামে শহীদ হন । ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুরে এস ফোর্সের অধিনায়ক তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম এর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। ঐ যুদ্ধে দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং ১১ জন আহত হন । পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫ জন নিহত ও ১৪ জন বন্দী হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা হয়েছে কুল্লাপাথর শহীদ স্মৃতিসৌধ। এখানে ৫০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে।

ঐতিহ্য[সম্পাদনা]

মুঘল আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মসলিন কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। এ জেলার বিখ্যাত মিষ্টান্নের মধ্যে ছানামুখী অন্যতম, যা দেশের অন্য কোন অঞ্চলে তেমন প্রচলন নেই। এছাড়া তালের রস দিয়ে তৈরি আরেকটি মিষ্টান্ন তালের বড়া ও রসমালাই বিখ্যাত।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ [সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ৯টি উপজেলা, ৯টি থানা, ৫টি পৌরসভা, ১০০টি ইউনিয়ন, ৯৯৩টি মৌজা, ১৩৩১টি গ্রাম ও ৬টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত।

উপজেলাসমূহ [সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মোট ৯টি উপজেলা রয়েছে। উপজেলাগুলো হল:

ক্রম নংউপজেলাআয়তন[২১]
(বর্গ কিলোমিটারে)
প্রশাসনিক থানাআওতাধীন এলাকাসমূহ
০১আখাউড়া৯৮.০৫আখাউড়াপৌরসভা (১টি): আখাউড়া
ইউনিয়ন (৫টি): মনিয়ন্দ, ধরখাড়, মোগড়া, আখাউড়া উত্তর এবং আখাউড়া দক্ষিণ
০২আশুগঞ্জ৬৭.৫৯আশুগঞ্জইউনিয়ন (৮টি): আশুগঞ্জ সদর, চর চারতলা, দুর্গাপুর, তালশহর পশ্চিম, আড়াইসিধা, শরীফপুর, লালপুর এবং তারুয়া
০৩কসবা২০৯.৭৮কসবাপৌরসভা (১টি): কসবা
ইউনিয়ন (১০টি): মূলগ্রাম, মেহারী, বাদৈর, খাড়েরা, বিনাউটি, গোপীনাথপুর, কসবা পশ্চিম, কুটি, কায়েমপুর এবং বায়েক
০৪নবীনগর৩৫০.৩৩নবীনগরপৌরসভা (১টি): নবীনগর
ইউনিয়ন (২১টি): বড়াইল, বীরগাঁও, কৃষ্ণনগর, নাটঘর, বিদ্যাকুট, নবীনগর পূর্ব, নবীনগর পশ্চিম, কাইতলা উত্তর, বিটঘর, শিবপুর, ইব্রাহিমপুর, শ্রীরামপুর, লাউর ফতেপুর, জিনোদপুর, রসুল্লাবাদ, সাতমোড়া, শ্যামগ্রাম, ছলিমগঞ্জ, বড়িকান্দি, কাইতলা দক্ষিণ এবং রতনপুর
০৫নাসিরনগর২৯৪.৩৬নাসিরনগরইউনিয়ন (১৩টি): চাতলপাড়, ভলাকুট, কুণ্ডা, গোয়ালনগর, নাসিরনগর, বুড়িশ্বর, ফান্দাউক, গুনিয়াউক, চাপৈরতলা, গোকর্ণ, পূর্বভাগ, হরিপুর এবং ধরমণ্ডল
০৬বাঞ্ছারামপুর১৮৭.৩১বাঞ্ছারামপুরপৌরসভা (১টি): বাঞ্ছারামপুর
ইউনিয়ন (১৩টি): তেজখালী, পাহাড়িয়াকান্দি, দরিয়াদৌলত, সোনারামপুর, দড়িকান্দি, ছয়ফুল্লাকান্দি, বাঞ্ছারামপুর, আইয়ুবপুর, ফরদাবাদ, রূপসদী, ছলিমাবাদ, উজানচর এবং মানিকপুর
০৭বিজয়নগর২২১.১৭বিজয়নগরইউনিয়ন (১০টি): বুধন্তি, চান্দুরা, ইছাপুরা, চম্পকনগর, হরষপুর, পত্তন, সিংগারবিল, বিষ্ণুপুর, চর ইসলামপুর এবং পাহাড়পুর
০৮ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর২৩৭.৩৪ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরপৌরসভা (১টি): ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ইউনিয়ন (১১টি): মজলিশপুর, বুধল, সুহিলপুর, তালশহর পূর্ব, নাটাই উত্তর, নাটাই দক্ষিণ, রামরাইল, সুলতানপুর, বাসুদেব, মাছিহাতা এবং সাদেকপুর
০৯সরাইল২১৫.২৮সরাইলইউনিয়ন (৯টি): অরুয়াইল, পাকশিমুল, চুণ্টা, কালিকচ্ছ, পানিশ্বর, সরাইল সদর, নোয়াগাঁও, শাহজাদাপুর এবং শাহবাজপুর

সংসদীয় আসন[সম্পাদনা]

সংসদীয় আসনজাতীয় নির্বাচনী এলাকাসংসদ সদস্যরাজনৈতিক দল
২৪৩ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১নাসিরনগর উপজেলাবদরুদ্দোজা মোঃ ফরহাদ হোসেনবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
২৪৪ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২সরাইল উপজেলা এবং আশুগঞ্জ উপজেলাআবদুস সাত্তার ভূঞাবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল
২৪৫ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা এবং বিজয়নগর উপজেলাউবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
২৪৬ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪আখাউড়া উপজেলা এবং কসবা উপজেলাআনিসুল হকবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
২৪৭ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫নবীনগর উপজেলাএবাদুল করিম বুলবুলবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
২৪৮ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬বাঞ্ছারামপুর উপজেলাএ বি তাজুল ইসলামবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

যোগাযোগ ব্যবস্থা [সম্পাদনা]

আশুগঞ্জ-ভৈরব রেল সেতু (রাজা ৬ষ্ঠ জর্জ রেলসেতু)

সড়কপথ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দুটি হাইওয়ে রোডের সাথে যুক্ত, একটি হল ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, যেটি এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক এর অংশ এবং অপরটি হল কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক। সরাইল উপজেলার বিশ্বরোডে দুটি হাইওয়ে রোড মিলিত হয়েছে।তাছাড়া ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য আখাউড়া হয়ে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে এবং আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেন সড়কের কাজও চলছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে নদীর উপর রয়েছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু যা আশুগঞ্জ ও ভৈরবের মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে। এটি ২০০২ সালে নির্মিত এবং এর দৈর্ঘ্য ১২০০ মিটার। সেতুটির পূর্ব নাম বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সেতু। এটির পাশেই রয়েছে ১৯৩৭ সালে নির্মিত রাজা ৬ষ্ঠ জর্জ রেলসেতু। এর বর্তমান নাম শহীদ হাবিলদার আব্দুল হালিম সেতু।

রেলপথ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাথে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগ রয়েছে। আখাউড়া রেলওয়ে জংশন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন। আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই আখাউড়া-আগরতলা রেললাইন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া আশুগঞ্জ-ভৈরব দ্বিতীয় রেল সেতু বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে।

নৌপথ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নৌ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম তিতাস ও মেঘনা নদী। শাখা নদীর মধ্যে রয়েছে হুরল, সিংরা কালাছড়া, বালুয়া, আউলিয়া জুড়ি, পাগলা, ডোল ভাঙ্গা, বলভদ্র, বিজনা, লংঘন, লহুর, রোপা, সোনাই, ছিনাইহানি প্রভৃতি। আশুগঞ্জ ঘাটের সাথে হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও কিশোরগঞ্জের লঞ্চ যোগাযোগ রয়েছে । তাছাড়া আশুগঞ্জে আন্তর্জাতিক নৌ-বন্দর স্থাপন করা হয়েছে এবং এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ।

আবহাওয়া [সম্পাদনা]

আবহাওয়া তথ্য
মাসজানুফেব্রুমার্চএপ্রিলমেজুনজুলাইআগস্টসেপ্টেঅক্টোনভেডিসেবছর
সর্বোচ্চ গড় °সে (°ফা)২৫
(৭৭)
২৮
(৮২)
৩২
(৯০)
৩৩
(৯১)
৩৩
(৯১)
৩২
(৯০)
৩২
(৯০)
৩২
(৯০)
৩২
(৯০)
৩১
(৮৮)
২৯
(৮৪)
২৭
(৮১)
৩১
(৮৭)
দৈনিক গড় °সে (°ফা)১৮
(৬৪)
২২
(৭২)
২৬
(৭৯)
২৮
(৮২)
২৮
(৮২)
২৯
(৮৪)
২৯
(৮৪)
২৯
(৮৪)
২৮
(৮২)
২৭
(৮১)
২২
(৭২)
২২
(৭২)
২৫
(৭৭)
সর্বনিম্ন গড় °সে (°ফা)১০
(৫০)
১৪
(৫৭)
১৯
(৬৬)
২২
(৭২)
২৩
(৭৩)
২৫
(৭৭)
২৫
(৭৭)
২৫
(৭৭)
২৪
(৭৫)
২৩
(৭৩)
১৭
(৬৩)
১৭
(৬৩)
২০
(৬৯)
অধঃক্ষেপণের গড় মিমি (ইঞ্চি)১৪.৪
(০.৫৭)
৩৯.৮
(১.৫৭)
৭২.৮
(২.৮৭)
১৬৮.২
(৬.৬২)
৩১৫.৪
(১২.৪২)
৩৪৪.৯
(১৩.৫৮)
৩৬৭.৯
(১৪.৪৮)
২৪৭.৫
(৯.৭৪)
১৯৭.৬
(৭.৭৮)
১৪৮.৫
(৫.৮৫)
৩০.৪
(১.২০)
৮.৯
(০.৩৫)
১,৯৫৬.৩
(৭৭.০৩)
অধঃক্ষেপণ দিনগুলির গড় (≥ ০.১ mm)৪৫৭১২১৯২৩২৮২৬২২১৩৩১১৬৩
উৎস: Worldweatheronline

জনসংখ্যার উপাত্ত [সম্পাদনা]

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোট জনসংখ্যা ২৮,৪০,৪৯৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩,৬৬,৭১১ জন এবং মহিলা ১৪,৭৩,৭৮৭ জন। মোট পরিবার ৫,৩৮,৯৩৭টি।

শিক্ষা ব্যবস্থা [সম্পাদনা]

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাক্ষরতার হার ৪৫.৩%। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। এ জেলায় ৪১টি কলেজ, ৩টি কারিগরী, ৮৯৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৮২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি ল’কলেজ, ১টি নার্সিং ইন্সটিটিউট, ১টি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল, ১টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, ১টি পিটিআই রয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান [সম্পাদনা]

উচ্চ বিদ্যালয় [সম্পাদনা]

  • অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • শাহবাজপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
  • বিটঘর রাধানাথ উচ্চ বিদ্যালয়
  • সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
  • বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আখাউড়া
  • ঘাটিয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়
  • কাইতলা যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়
  • খাড়েরা মুহাম্মািয়া উচ্চ বিদ্যালয়।
  • আখাউড়া রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
  • চান্দপুর তমিজ উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়
  • বুগীর ডাঃ হাবিবুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়
  • বাকাইল উচ্চ বিদ্যালয়

মহাবিদ্যালয় (কলেজ) [সম্পাদনা]

  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজ
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিটি কলেজ
  • সুর সম্রাট আলাউদ্দীন খাঁ ডিগ্রি কলেজ
  • কালসার নাঈমা আলম মহিলা ডিগ্রি কলেজ
  • নাসিরনগর সরকারি কলেজ
  • কসবা টি.আলি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
  • কসবা (কামালপুর) টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ
  • নবীনগর সরকারি কলেজ
  • সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়, সৈয়দাবাদ
  • ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজ
  • আলীম উদ্দিন জোবেদা অনার্স কলেজ
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজ
  • বিটঘর দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য কলেজ
  • অরুয়াইল আবদুস সাত্তার কলেজ

মাদ্রাসা [সম্পাদনা]

  • আদমপুর সিনিয়র ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা আদমপুর,পত্তন,বিজয়নগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
  • শ্রীপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বিজয়নগর।
  • আড়াইবাড়ী ইসলামিয়া সাঈদিয়া কামিল মাদ্রাসা
  • শ্রীপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা, কসবা।
  • ঘাটিয়ারা আলিম মাদ্রাসা
  • পুরকুইল গাউছিয়া হাবিবিয়া ফাজিল মাদ্রাসা
  • জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
  • জামিয়া শারইয়্যাহ সিরাজুল উলুম, সিরাজবাগ, রহিমপুর
  • জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলূম ভাদুঘর মাদ্রাসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
  • সোনার গাঁও জিলানীয়া আলিম মাদ্রাসা
  • কাছাইট ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা

শিল্প ও অর্থনীতি [সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাঁত শিল্প বিখ্যাত। ১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত ও ১৯৬৮ সালে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ড দেশের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ করে। আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। আশুগঞ্জ সার কারখানা দেশের ইউরিয়া সারের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প কারখানা। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া বন্দর। এ বন্দরের মাধ্যমে ভারতে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। এটি ১৯৯৪ সালে স্থাপিত হয়। এখানে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপিত হয় ১৯৮৫ সালে।

সংস্কৃতি ও খেলাধুলা[সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ,আলী আকবর খান,বাহাদুর খান এর মত খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞের জন্ম এখানে । উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যাদের অবদান অসীম । পুতুল নাচের জন্যও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিখ্যাত । ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল ।

ঐতিহ্যবাহী উৎসব

  • নৌকা বাইচ – ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে শত বছর যাবত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । প্রতিবছর মনসা পূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসের প্রথম তারিখে তিতাস নদীতে এ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয় ।
  • আসিল মোরগ লড়াই – ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এই ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই অনুষ্ঠিত হয়
  • গরুর দৌড় – বাঞ্ছারামপুর থানার রূপসদী গ্রামে এই ঐতিহ্যবাহী গরুর দৌড় অনুষ্ঠিত হয়
  • ভাদুঘরের বান্নী (মেলা) – ভাদুঘর তিতাস নদীর তীরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়
  • খড়মপুর কেল্লাশাহ (র) মাজার শরীফ এর বার্ষিক ওরশ
  • চিলোকুট গ্রামে সৈয়দ আঃ রউফ এর ওরশ

খেলাধুলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনপ্রিয় খেলা হল – ক্রিকেট,ফুটবল,ব্যাডমিন্টন। ঐতিহ্যবাহী খেলার মধ্যে রয়েছে – নৌকা বাইচ,লাঠিখেলা,গরু দৌড়,আসিল মোরগ লড়াই। ২০১৪-১৫ মৌসুমে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেটের শিরোপা জিতেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনূর্ধ্ব-১৬ ও ১৮ দল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্রীড়াঙ্গনের মূলকেন্দ্র নিয়াজ মোহাম্মদ স্টেডিয়াম। তৎকালীন এসডিও নিয়াজ মোহাম্মদ খান ১৯৩৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন , যা দেশের প্রাচীনতম স্টেডিয়াম। এ জেলার বিখ্যাত খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছেন ক্রিকেটার প্রবীর সেন , যিনি ডন ব্র্যাডম্যানের বিপক্ষে খেলেছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আশরাফুল ।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ [সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ব্যক্তিবর্গের তালিকা

দর্শনীয় স্থান সমূহ [সম্পাদনা]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহ হল –

  • গোকর্ণ নবাব বাড়ি কমপ্লেক্স (সৈয়দ শামসুল হুদার বাড়ি) – নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ গ্রামে অবস্থিত।
  • কালাছড়া চা বাগান – ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একমাত্র চা বাগান। অন্য নাম ‘হরিহর টি এস্টেট’। বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কালাছড়া গ্রামে অবস্থিত।
  • আখাউড়া স্থল বন্দর – আগরতলা-আখাউড়া সীমান্তে বিকালে অনুষ্ঠিত (বিএসএফ) ও (বিজিবি) এর যৌথ কুচকাওয়াজ।
  • কসবা সীমান্ত হাট – কসবা উপজেলায় রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট।
  • ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন অর্কিড প্রজেক্ট – সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে অবস্থিত।
  • বিজয়নগর উপজেলার লিচু বাগান – এখানকার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হল আউলিয়া বাজার ও মেরাশানী বাজার ।
  • আনন্দ ভুবন -বল্লভপুর শিমরাইলের মহামিলন,রাজার খালের উপর নির্মিত ব্রীজের দু’পাশ।
  • নারুই ব্রীজ -নারুই ব্রাহ্মানহাতার তিতাস নদীর উপর নির্মিত ব্রীজের দু’পাশ, যার অপরূপ পরিবেশ দেখার জন্য পর্যটকদের আগমন ঘটে।
  • নবীনগর লঞ্চঘাট সংলগ্ন বুড়ি নদীর অপরূপ দৃশ্য
  • রূপসদী জমিদার বাড়ি
  • জয়কুমার জমিদার বাড়ি
  • হরষপুর জমিদার বাড়ি

উৎস:- উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে