ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আনন্দবাজারে ইলিশ মাছ বিক্রির সময় ওজন কম দেওয়ার অভিযোগে এক মাছ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে বিশেষ কৌশলে কারচুপি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে তাঁকে এই জরিমানা করা হয়।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে শহরের আনন্দবাজারের মাছের আড়তে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইফতেখারুল আলম।
জরিমানার মুখে পড়া মাছ বিক্রেতার নাম আপেল মাহমুদ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার আনন্দবাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে ইলিশ বিক্রির সময় ওজন পরিমাপের পদ্ধতি পরীক্ষা করতে গিয়ে কারচুপির বিষয়টি ধরা পড়ে।
অভিযান সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আপেল মাহমুদ তাঁর ব্যবহৃত ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে অভিনব কৌশলে পরিবর্তন করেছিলেন। যন্ত্রটির ভেতরের একটি অংশের সঙ্গে রাবারের রশি সংযুক্ত করা হয়। পরে সেটি গামছার আড়ালে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী টেনে বা ঢিলা করে ওজনের হিসাবে প্রভাব ফেলা হতো। ফলে ক্রেতার সামনে ওজন ঠিক আছে বলে মনে হলেও প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় কম মাছ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
এ ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে একজন ক্রেতা নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশের দাম পরিশোধ করলেও হাতে পেতেন তুলনামূলক কম ওজনের মাছ। বিষয়টি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সহজে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। কারণ ডিজিটাল পাল্লায় প্রদর্শিত ওজন দেখে ক্রেতারা সাধারণত মাছের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযান চালানোর সময় ওজন যন্ত্রটি পরীক্ষা করেন। তখন যন্ত্রের সঙ্গে রাবারের রশি সংযুক্ত থাকার বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। পরবর্তীতে কীভাবে ওই রশি ব্যবহার করে ওজনের হিসাব পরিবর্তন করা হচ্ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা বিক্রেতার দায়িত্ব। কোনো পণ্য বিক্রির সময় পরিমাপে কারচুপি করে ক্রেতাকে ঠকানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিশেষ করে মাছের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইফতেখারুল আলম বলেন, অভিযান চলাকালে মাছ বিক্রেতা আপেল মাহমুদের ওজন যন্ত্রে কারচুপির বিষয়টি ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করেন। পরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী তাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীদের অবশ্যই নির্ধারিত নিয়ম মেনে পণ্য বিক্রি করতে হবে। ক্রেতার কাছ থেকে নির্ধারিত দামের বিনিময়ে সঠিক পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা তাঁদের দায়িত্ব। ওজন বা পরিমাপে কোনো ধরনের কারচুপি করে ক্রেতাদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জরিমানার পর আপেল মাহমুদ ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম করবেন না বলে কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর ব্যবহৃত ওজন যন্ত্রের কারচুপির বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।
আনন্দবাজার শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হওয়ায় প্রতিদিন সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ কিনতে ক্রেতাদের ভিড় থাকে। ইলিশের মৌসুমে এই বাজারে মাছের বেচাকেনা আরও বেড়ে যায়। ফলে ওজনে কারচুপির মতো ঘটনা ঘটলে একদিকে যেমন ক্রেতারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এমন অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হলে বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ক্রেতাদেরও পণ্য কেনার সময় ওজন ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, বাজারে কোনো বিক্রেতা ওজন বা পরিমাপে কারচুপি করছেন বলে সন্দেহ হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যেতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনন্দবাজারে ইলিশ বিক্রির সময় ওজন যন্ত্রে কারচুপির অভিযোগে এক বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানার ঘটনা স্থানীয় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ ধরনের অভিযান বাজারে সঠিক ওজন ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আরও সতর্ক করবে।

