সংসদ ভবন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই অশালীন ভাষা ব্যবহারের সুযোগে পরিণত না হয়।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কেউই যেন আবার ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশও যেন পারস্পরিক কটূক্তি ও গালাগালির সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়। এ বিষয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জনপরিসরে ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারে যেসব শব্দ ব্যবহার করতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, সেগুলো প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যসহ দেশের সচেতন নাগরিকদের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রতিযোগিতাও স্বাভাবিক। তবে মতের অমিল যেন ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিদ্বেষে পরিণত না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা শেষ পর্যন্ত পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সবাই মিলে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর সরকারের মূল প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
সংসদকে কার্যকর করার প্রত্যয়
জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে সংসদকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন সমস্যা, জনদুর্ভোগ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদে মতপার্থক্য থাকলেও জনগণের স্বার্থে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সদিচ্ছার ঘাটতি ছিল না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়, বরং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সমস্যার কথা তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। দেশের সাধারণ মানুষ তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সংসদে তুলে ধরার সুযোগ পান। এসব সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব।
তিনি সংসদ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা যত বাড়বে, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তত বেশি কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সংসদকে আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখতে ভূমিকা রাখায় সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
তাঁর মতে, জনগণ এই সংসদের কাছে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সেগুলোর সমাধানের প্রত্যাশা রাখে। সংসদ যেন মানুষের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই জনগণের মূল প্রত্যাশা। ভবিষ্যতেও সংসদকে রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অর্থনীতি ও ঋণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আগের সরকারের সময়কার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থপাচার এবং আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকারের সামনে ঋণের বোঝা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের দায় এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপির হার কমিয়ে ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের মূল অর্থ ও সুদ বাবদ মোট ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর জন্য সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর দাবি, বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দেশে ঋণখেলাপির অনুপাতও কমেছে। নির্বাচনের পর যেখানে এ হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। তিনি এটিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে শুধু ঋণ পরিশোধ করলেই হবে না, একই সঙ্গে নতুন করে অনিয়ম ও অর্থপাচারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। অর্থনীতির ওপর ঋণের চাপ কমানো, রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের সুফল ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ পেতে শুরু করবেন। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধিবেশন শেষ
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শেষ দিনে সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন এবং সরকারের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম রাষ্ট্রপতির দেওয়া অধিবেশন সমাপ্তির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান। এর মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সমাপনী দিনে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তিনি অধিবেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং দেশের চলমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে তাঁর সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সংসদের ভূমিকা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে হলে মতের ভিন্নতা থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংসদকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

