উপাচার্য হেনস্তার ঘটনায় বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে চাপ প্রয়োগ করে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে করা মামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একই ঘটনায় রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন তা শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মামলাটি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইন। তাঁর করা অভিযোগে সরকারি কাজে বাধা, বিশ্ববিদ্যালয়ের মালামাল বা সরঞ্জাম চুরি, ভাঙচুরসহ একাধিক অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান জানান, অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে মামলাটি হয়েছে। ঘটনার সময়কার ভিডিও ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণের পাশাপাশি অন্যান্য তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকেই অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের দপ্তরটি বন্ধ রয়েছে। সেখানে তালা ঝুলছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। অভিযোগ অনুযায়ী, একদল ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তাঁকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। উপাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, কাগজটিতে কী লেখা ছিল তা তাঁকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

অধ্যাপক জাওয়াদুল হক পরে সাংবাদিকদের জানান, ওই পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছিলেন না। স্বাক্ষর না করলে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি কাগজটিতে স্বাক্ষর করেন। তাঁর ধারণা, সেটি ছিল তাঁর পদত্যাগপত্র।

ঘটনার পর বিকেলে গেস্ট হাউসের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপাচার্য। তিনি দাবি করেন, প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কক্ষে প্রবেশ করেছিল। তাঁকে চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে বলা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর সামনে একটি কাগজ রাখা হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়।

উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাক্ষর করার পর ওই ব্যক্তিরা কাগজটি নিয়ে নেন এবং তাঁকে কার্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

মামলা হওয়ার পর তদন্তের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘটনার আগে ও পরের পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে কারা উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন, কারা তাঁকে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দিয়েছিলেন এবং ওই সময় সেখানে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে একজনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে আরও যাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

গ্রেপ্তার হওয়া আবদুস সালাম একসময় রাজশাহী মহানগরের রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তবে গত আগস্টে ওই কমিটি স্থগিত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের দপ্তরে তালা থাকায় স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম কতটা প্রভাবিত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য সামনে আসতে পারে।

তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুনঃ বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে রামেবি উপাচার্য

Related Posts

About The Author