কুমিল্লার লাকসামে কর্ণফুলী কমিউটার এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামত সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে মেরামত শেষ হলেও দুর্ঘটনাকবলিত একটি বগি সরানো না যাওয়ায় বেলা ১১টা পর্যন্ত ওই অংশ দিয়ে ঢাকামুখী লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়নি।
লাকসাম রেলওয়ে জংশন স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া জানান, মেরামতের পর রেললাইনটি ট্রেন চলাচলের উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনাস্থলে বগি পড়ে থাকায় ওই লাইন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে আসা চট্টলা এক্সপ্রেস লাকসাম জংশন অতিক্রম করে। ট্রেনটি দুর্ঘটনাস্থল পার হয় চট্টগ্রামমুখী ডাউনলাইন দিয়ে। একইভাবে সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে পাহাড়িকা এক্সপ্রেসও ওই লাইন ব্যবহার করে লাকসাম অতিক্রম করে।
রেলওয়ে জংশন সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা বগিটি সরাতে নাঙ্গলকোট স্টেশন থেকে একটি ইঞ্জিন পাঠানো হয়। বগি অপসারণের কাজ শেষ না হওয়ায় মেরামত সম্পন্ন হলেও ঢাকামুখী আপলাইনে ট্রেন চলাচল চালু করা সম্ভব হয়নি। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ওই অংশে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে আপলাইন বন্ধ থাকে।
এর আগে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাকসাম উপজেলার আজগরা বাজারের কাছে নাওটি স্টেশনের আউটার এলাকায় কর্ণফুলী কমিউটার এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এ সময় ইঞ্জিনের তিনটি চাকাসহ ট্রেনটির পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনায় অন্তত সাতজন যাত্রী আহত হন। পরে তাঁরা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর উদ্ধারকাজ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে লাইনচ্যুত ট্রেন সরানোর কাজ শেষ হয়। এরপর রেললাইন মেরামত করে সকাল ৭টার দিকে কাজ সম্পন্ন করা হয়।
দুর্ঘটনার পর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকামুখী আপলাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রামমুখী ডাউনলাইন ব্যবহার করে দুই দিকের ট্রেন চালানো হচ্ছিল। এতে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা। এই পথে প্রতিদিন আন্তনগর, মেইল ও কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। ফলে কোনো একটি অংশে লাইন বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব অন্য ট্রেনের চলাচলেও পড়তে পারে। বিশেষ করে একটি লাইন ব্যবহার করে দুই দিকের ট্রেন পরিচালনা করতে হলে ট্রেনের ক্রসিং ও চলাচলের সময়সূচি সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়ে।
লাকসামের দুর্ঘটনার পরও বিকল্প লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল চালু রাখা হয়েছিল। তবে একই লাইন দুই দিকের ট্রেনের জন্য ব্যবহার করায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে যাত্রীদের যাত্রার সময় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দূরপাল্লার যাত্রীদের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রয়োজন রয়েছে—এমন যাত্রীরাও সমস্যায় পড়তে পারেন।
এ ধরনের দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় মেরামত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মেরামত শেষ হলেই ট্রেন চলাচল শুরু করা যায় না; দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজের অবশিষ্ট অংশ সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে দুর্ঘটনাস্থলে রেললাইন মেরামতের কাজ চলার বিষয়টি রেলওয়ের কন্ট্রোল রুমকে অবহিত না করার অভিযোগে প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সারোয়ার আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তদন্তে দুর্ঘটনার পেছনে কী কারণ ছিল, রেললাইন বা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা ঘটেছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তবে তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে রেললাইন মেরামত, কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধারকাজের সমন্বয় আরও কার্যকর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

