সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে দেশটির কারাগারে আটক ছিলেন। তবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কিংবা পরে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সম্প্রতি সৌদি আরবে বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রম কল্যাণ উইং থেকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৮ অক্টোবর পাঠানো ওই নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি কোনো তথ্য না পেয়ে দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকেই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশি কনস্যুলেট। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১৪ অক্টোবর এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতির বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অভিযোগ ছিল, পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে তাঁরা মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করেছেন।
কনস্যুলেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছিল। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর একটি তালিকা পাওয়া যায়। এতে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তালিকায় কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না।
তালিকার তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে আটক করা হয়। এর পরদিন সুইটি আক্তারকে ব্যভিচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। নজরুল জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি জেদ্দার নারী কারাগারে ছিলেন।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, তাঁরা সৌদি আরবের আল মাজাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তবে তাঁদের মামলার পূর্ণ বিবরণ, আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কনস্যুলেটের কাছে ছিল না।
কনস্যুলেটের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক দুই বাংলাদেশির সাজা সম্পর্কে পাওয়া তালিকায় কোনো তথ্য ছিল না। এমনকি তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা বা তা কার্যকরের বিষয়েও সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত করেনি।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে সৌদি আরবে আগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির তাঁদের জানা নেই। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের রায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কনস্যুলেটের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে নৈতিকতা-সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় মোট ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণার তথ্য পাওয়া গেছে।
নথিতে উল্লেখিত সাজাগুলোর মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। তবে বাকি আটক ব্যক্তিদের মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ওই চিঠিতে পাওয়া যায়নি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার জন্য কনস্যুলেটে কোনো আবেদন জমা পড়েনি। এ বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।
দুই বাংলাদেশির মামলার প্রকৃত পরিস্থিতি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে জেদ্দা কনস্যুলেট।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার বিস্তারিত নথি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়া গেলে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আপাতত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নথি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশি কনস্যুলেট।

