ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে ভারতে যাওয়ার সময় হত্যা মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে ইমিগ্রেশন কার্যক্রমের সময় তার পরিচয় ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করতে গিয়ে মামলা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম ইদ্রিস আলী। তিনি ঢাকার আশুলিয়া থানার জামপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলী আহম্মদের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। এসব মামলার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগে মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইমিগ্রেশন পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইদ্রিস আলী তার ছোট বোন ও ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে উপস্থিত হন। নিয়ম অনুযায়ী সীমান্ত পার হওয়ার আগে তার পাসপোর্ট, পরিচয় এবং সরকারি ডাটাবেজে থাকা তথ্য পরীক্ষা করা হয়।
তথ্য যাচাইয়ের একপর্যায়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা দেখতে পান, ইদ্রিস আলীর নামে আশুলিয়া থানায় দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। একই সঙ্গে তার দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকার তথ্যও পাওয়া যায়। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আর ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, ইদ্রিস আলী ভারতে যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে এসেছিলেন। তার কাগজপত্র যাচাই করার সময় ডাটাবেজে থাকা মামলার তথ্য ধরা পড়ে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর ইদ্রিস আলীকে আখাউড়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন ও ভাগ্নেকেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ যাচাই করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে শুধু হত্যা মামলাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগেও মামলা রয়েছে। ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, অবৈধ অস্ত্র রাখা ও অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অভিযোগের কথাও মামলাগুলোতে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার নথি ও অভিযোগ যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে দেশত্যাগের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে যাত্রীদের তথ্য যাচাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা আদালতের নির্দেশে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজে সেই তথ্য থাকার কথা। আখাউড়া চেকপোস্টে ইদ্রিস আলীর ক্ষেত্রে যাচাইয়ের সময় এমন তথ্যই সামনে আসে।
আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রী চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তপথ। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই চেকপোস্ট ব্যবহার করে ভারতে যাতায়াত করেন। এ কারণে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যাত্রীদের কাগজপত্র এবং সরকারি তথ্য যাচাই করা হয়।
ইদ্রিস আলীর ক্ষেত্রেও একই নিয়মে তথ্য যাচাই করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার তথ্য শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি আর সাধারণ যাত্রীর মতো বিবেচনা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরে স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আখাউড়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, ইদ্রিস আলীকে হস্তান্তরের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশুলিয়া থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাসহ অন্যান্য মামলার বর্তমান অবস্থা, আদালতের নির্দেশনা এবং তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলো যাচাই করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ইনচার্জ এসআই মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ইদ্রিস আলী সকালে ভারতে যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেশনে আসেন। নিয়মিত যাচাইয়ের সময় তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে গ্রেপ্তার করে আখাউড়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট থানার তথ্য পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে তার সঙ্গে ভারতে যাওয়ার জন্য আসা স্বজনদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত বাধা না থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে দেশত্যাগের সময় এ ধরনের গ্রেপ্তারের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে যাত্রীদের তথ্য যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আইনগত জটিলতা থাকা কোনো ব্যক্তি যাতে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর

