বিলুপ্ত র‍্যাব, নতুন নামে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল পাস

বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে সংসদে বিল পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

তবে নতুন আইন নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন হলেও বাহিনীটির বিদ্যমান কাঠামো ও সম্পদের বড় অংশ নতুন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ফলে বাস্তবে র‍্যাব বিলুপ্ত না হয়ে নতুন পরিচয়ে একই কাঠামো চালু থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বিলের বিধান অনুযায়ী, র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, তহবিল, দায়িত্ব, ক্ষমতা, বিভিন্ন নথিপত্র, চুক্তি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এসআরবির কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ কারণে বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য এটিকে শুধু নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র‍্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং এসআরবি হবে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোর একটি ইউনিট। র‍্যাব ও এসআরবিকে একই বাহিনী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

এসআরবির কাঠামো ও দায়িত্ব

নতুন আইনে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যকে এ ইউনিটে নিয়োগ বা প্রেষণে পাঠানো যেতে পারে।

এসআরবির কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিয়োগ, পদবিন্যাস এবং চাকরির অন্যান্য শর্ত পরবর্তী সময়ে বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ইউনিটটির জন্য আলাদা পতাকা, প্রতীক ও নির্ধারিত পোশাক থাকার বিধানও রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, এসআরবির মহাপরিচালক হিসেবে পুলিশের একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বা তার চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।

নতুন ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা এবং জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে।

র‍্যাবের সম্পদ কোথায় যাবে?

বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো র‍্যাবের বিদ্যমান সম্পদ ও সাংগঠনিক উপকরণের হস্তান্তর। আইন অনুযায়ী র‍্যাবের জনবল, অর্থ, ব্যাংক হিসাব, বিভিন্ন সরঞ্জাম, অস্ত্র, সম্পত্তি, নথি, রেকর্ড, চুক্তি এবং দায়-দায়িত্ব এসআরবির কাছে স্থানান্তর করা হবে।

এ ছাড়া নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত র‍্যাব-সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ যাতে নষ্ট বা অকার্যকর না হয়, সেজন্য বিদ্যমান সরঞ্জাম ও সম্পদ নতুন ইউনিটের কাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বিরোধী দলের আপত্তি

সংসদে বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু র‍্যাবের জায়গায় একই ধরনের আরেকটি বিশেষ বাহিনী তৈরির দাবি ছিল না।

তিনি বলেন, র‍্যাবের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। তাই বাহিনীটির নাম পরিবর্তনের পরিবর্তে কেন নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হচ্ছে, সেটি আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বিরোধী দলের আরেক সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, র‍্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত আইন পাসের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানও বিলটির কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য, র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, কার্যালয় ও নথিপত্র যদি নতুন ইউনিটের কাছে চলে যায়, তাহলে বাহিনীটির কাঠামোগত পরিবর্তন কতটা হচ্ছে—সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের বক্তব্য

বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, র‍্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, এই আইন পাসের মাধ্যমে সেটিই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ কোথাও না কোথাও ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে। সেগুলো নতুন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, র‍্যাব এবং এসআরবি এক নয়। নতুন আইনের মাধ্যমে র‍্যাবের পরিবর্তে পুলিশের অধীনে আলাদা কাঠামোর বিশেষায়িত ইউনিট তৈরি করা হচ্ছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি আরও পর্যালোচনার জন্য বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং জনমত নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়ে যায়। এরপর বিলটি সংসদে পাস হয়।

এপিবিএন আইনেও পরিবর্তন

এসআরবি বিলের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল–২০২৬’-ও সংসদে পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে পুরোনো আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স বাতিল করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

নতুন আইনে পুলিশের অধীনে এপিবিএন পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নসহ অন্যান্য ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএন সদস্যদের ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বাহিনীর সদস্যরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে বাহিনী-সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা নথি প্রকাশ করতে পারবেন না—এমন বিধানও রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ভারতীয় ১০ টন জিরাসহ তিনজন আটক

Related Posts

About The Author