যুবদল নেতার বিরুদ্ধে দুই রেলকর্মীকে মারধরের অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে ফোনে যোগাযোগ না করাকে কেন্দ্র করে তিতাস কমিউটার ট্রেনের টিকিট কাউন্টারের ব্যবস্থাপক ও এক বুকিং ক্লার্ককে চড়-থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে তিতাস কমিউটার ট্রেনের টিকিট কাউন্টার প্রায় আড়াই ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে টিকিট কিনতে এসে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাউন্টার পুনরায় চালু করা হয়।

অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি হলেন নাজমুল হুদা ওরফে সানি। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। আর কথিত মারধরের শিকার দুজন হলেন তিতাস কমিউটার ট্রেনের টিকিট কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ওরফে সজীব এবং বুকিং ক্লার্ক মো. কাউসার হোসেন।

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, সোমবার বেলা ১১টার দিকে বুকিং ক্লার্ক কাউসার স্টেশনের স্টাফ কক্ষ থেকে টিকিট কাউন্টারের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় স্টেশন এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে কালোবাজারে বিক্রির জন্য টিকিট চেয়ে হেনস্তা ও মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিস্থিতির কারণে কিছু সময়ের জন্য তিতাস কমিউটার ট্রেনের টিকিট বিক্রি বন্ধ রাখা হয়। এর কিছুক্ষণ পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যুবদল নেতা নাজমুল হুদা স্টেশনে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কাউসারকে কাউন্টারের বাইরে ডেকে নিয়ে চড়-থাপ্পড় দেন।

বিষয়টি জানতে এগিয়ে গেলে কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে আশপাশের লোকজন সেখানে জড়ো হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং নাজমুল হুদাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনার পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই কর্মী দুপুর ২টা পর্যন্ত কাউন্টার বন্ধ রাখেন। এতে ওই সময়ে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে আসা সাধারণ যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়।

ঘটনার বিষয়ে তিতাস কমিউটার ট্রেনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার কিছু আগে যুবদল নেতা নাজমুল হুদা বুকিং ক্লার্ক কাউসারকে ফোন করেন। ফোনে তিনি দুটি টিকিটের কথা জানান এবং তাঁর দুজন লোক টিকিট নিতে আসবেন বলে উল্লেখ করেন।

কিন্তু সে সময় কাউন্টার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় টিকিট দেওয়া সম্ভব নয় বলে কাউসার তাঁকে জানান। পরে কাউন্টার চালু হলে লোক পাঠানোর কথা বলা হয়। এরপরই স্টেশনে এসে তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মহিউদ্দিন।

মহিউদ্দিনের দাবি, নাজমুল হুদা তাঁকে উদ্দেশ করে ফোন না ধরার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে স্থানীয় লোকজন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, নাজমুল হুদা দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে তিতাস কমিউটার ট্রেনের এজেন্টশিপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এতে সম্মতি দেয়নি বলে তাঁর দাবি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক মো. শাহ আলম মিয়া জানান, টিকিট কাউন্টারের ব্যবস্থাপক ও বুকিং ক্লার্ককে কয়েকজন ব্যক্তি এসে চড়-থাপ্পড় মেরে চলে যাওয়ার কথা তাঁরা জানতে পেরেছেন।

ঘটনার পর তিতাস কমিউটার ট্রেনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাউন্টার বন্ধ করে দেন। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগীরা তখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে মারধরের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন যুবদল নেতা নাজমুল হুদা। তাঁর দাবি, তিতাস কমিউটার ট্রেনের টিকিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও কালোবাজারির অভিযোগ রয়েছে।

নাজমুল হুদার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রেনের টিকিট কাউন্টারের বাইরে বেশি দামে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তিনি সংশ্লিষ্টদের আগেও জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ৭৫ টাকা মূল্যের টিকিট বাইরে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাইরে টিকিট বিক্রির বিষয়ে বারবার সতর্ক করার পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে চাপ দেওয়ার পরই সোমবার টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তাঁর বক্তব্য, কোনো যাত্রী নিয়ম মেনে কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে পরে সেটি বাইরে বেশি দামে বিক্রি করলে সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়।

তিনি দাবি করেন, কাউন্টার থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। এ বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে প্রতিদিন তিতাস কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনটি সকালে আখাউড়া রেলওয়ে জংশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে ঢাকা থেকে ফিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আবার চলাচল করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত এই ট্রেনের নির্ধারিত ভাড়া ৭৫ টাকা। তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তিতাস কমিউটার ট্রেনের চাহিদা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকিট কাউন্টার বন্ধ থাকলে সরাসরি সাধারণ যাত্রীদেরই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই টিকিট বিক্রি নিয়ে কোনো অনিয়ম বা বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযোগ পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুনঃ ইলিশের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে আসছে আরও ২০০ টন

Related Posts

About The Author