ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা বায়েক ইউনিয়নে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চক্র সঞ্চালন লাইনের গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করে চুন তৈরির কারখানায় সরবরাহের চেষ্টা করছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্টরা সেখান থেকে সরে গেছে বলে জানা গেছে।
কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের বালিহুরা এলাকায় সালদা গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ওই উচ্চচাপের সঞ্চালন লাইনের একটি অংশে সম্প্রতি দুটি ছিদ্র দেখতে পাওয়া যায়। একটি ছিদ্রের মাধ্যমে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেলেও অন্যটিতে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করে বিকট শব্দে গ্যাস বের হওয়ার আওয়াজ শোনা যায়। একই সঙ্গে আশপাশে গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। ওই এলাকায় ঘনবসতি থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের দাবি, চুন কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় সেখানকার একটি পক্ষ উচ্চচাপের জাতীয় সঞ্চালন লাইন থেকে সরাসরি গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বায়েক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তিনি ওই কারখানার জায়গাটি ঢাকার একটি পক্ষের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। ভাড়ার বিষয়ে লিখিত চুক্তিপত্রও রয়েছে। গ্যাস চুরির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে গ্যাস বের হওয়ার শব্দে অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। বালিহুরা গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ওই রাতে বিদ্যুৎও ছিল না। এমন অবস্থায় গ্যাসের লাইন থেকে কোনোভাবে আগুনের সূত্রপাত হলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মঞ্জু মিয়া বলেন, রাতের অন্ধকারে উচ্চচাপের গ্যাস লাইনে ছিদ্র করে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জিএম (অপারেশন) জাহিদুর রেজা জানান, সংশ্লিষ্ট পাইপলাইনটি প্রায় ১০ ইঞ্চি ব্যাসের এবং এটি উচ্চচাপের লাইনের অংশ। সালদা ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যবর্তী এই লাইনে প্রায় ৬০০ পিএসআই চাপ দিয়ে গ্যাস পরিবহন করা হচ্ছিল।
তিনি জানান, তদন্তে দেখা গেছে, কেউ ওই পাইপলাইনে দুটি অফটেক বের করার চেষ্টা করেছে। এর একটিতে সংযোগ দেওয়ার প্রাথমিক কাজ করা হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর গ্যাস কোম্পানির ভিজিল্যান্স বিভাগকে অবহিত করা হয়। পরে ড্রোনের মাধ্যমে আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে একটি চুন তৈরির কারখানার অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, কারখানাটিতে আগে থেকেই নিম্নচাপের গ্যাস সংযোগ ছিল। তবে সেই চাপ দিয়ে কারখানা পরিচালনা করা কঠিন হওয়ায় উচ্চচাপের লাইন থেকে গ্যাস নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট অংশের গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে পাইপলাইনের ভেতরের গ্যাসও বের করে দেওয়া হয়েছে।
পরে শনিবার বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবৈধভাবে ছিদ্র করা পাইপলাইন মেরামত করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ওই এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সালদা গ্যাসক্ষেত্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি মূলত বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষয়টি জানার পর তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন এবং মেরামতকাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়েছেন।
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম জানান, ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য লিখিতভাবে চাওয়া হয়েছে। তদন্তে গ্যাস চুরির সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে কসবার সালদা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ এখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে তিনটি কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে এই গ্যাসক্ষেত্রের সঞ্চালন লাইন নিরাপদ রাখা স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ ৪২ কিশোরকে আটক

