ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় প্রচলিত ধানের পাশাপাশি নতুন জাতের কালো ধান চাষ করে সম্ভাবনা যাচাই করছেন এক কৃষক। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগ সফল হলে আগামী মৌসুমে চাষের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। কৃষি খাতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি বিশেষ জাতের এই ধান থেকে বাড়তি আয় করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে।
আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের বীরচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক সাইমন মোল্লা চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে কালো ধান আবাদ করেছেন। ইতোমধ্যে ধানগাছে কালচে রঙের শিষ আসতে শুরু করেছে। নতুন ধরনের এ ধানের ক্ষেত দেখতে স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্য কৃষকেরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
সাইমন মোল্লা জানান, আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে দুই বিঘা জমিতে কালো ধান চাষ করেছেন তিনি। ফলন সন্তোষজনক হলে এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে পরবর্তী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে এ ধান আবাদ করবেন। তবে চাষ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ফলন ও বাজারদর সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান তিনি।
প্রচলিত ধান চাষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত সাইমন ইউটিউবে কালো ধান চাষের বিভিন্ন ভিডিও দেখে আগ্রহী হন। পরে প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বীজ সংগ্রহ করে বীজতলা তৈরি করেন। জমি প্রস্তুত করার পর সেখানে চারা রোপণ করেন তিনি। এরপর থেকে নিয়মিত পরিচর্যা করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর জমির ধানগাছে শিষ বের হওয়ার পর্যায় চলছে।
এই কৃষকের আশা, প্রতি বিঘা জমিতে ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রকৃত ফলন জানতে ধান কাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কতটা লাভ থাকবে, সেটিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কালো ধানের চাল সাধারণত গাঢ় বেগুনি থেকে প্রায় কালো রঙের হয়ে থাকে। চালের এই বিশেষ রঙের জন্য দায়ী অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদান। এ ছাড়া কালো চালে খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। বিশেষ ধরনের চাল হিসেবে এর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
কালো চাল দিয়ে সাধারণ ভাতের পাশাপাশি পায়েস, খিচুড়ি ও বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করা যায়। পুষ্টিগুণ ও ব্যতিক্রমী রঙের কারণে এটি সাধারণ চালের বাইরে একটি বিশেষ খাদ্যপণ্য হিসেবে বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় কালো চালের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রচলিত চালের তুলনায় কালো চালের দাম সাধারণত বেশি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পণ্য ও মানভেদে এর দাম প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। তবে এই দাম সব ধরনের কালো চালের জন্য প্রযোজ্য নয়। খুচরা বাজারের মূল্য এবং কৃষকের কাছ থেকে কেনার দামও এক নয়।
কালো ধান চাষে বীজ সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, সেচ, পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি ও ধান কাটার খরচ হিসাব করা জরুরি। উৎপাদনের পর চালের মান ঠিক রাখা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও লাভের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ জাতের এই চালের জন্য নির্দিষ্ট ক্রেতা বা নির্ভরযোগ্য বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকেরা উপকৃত হতে পারেন। তবে বাজারে চাহিদা কতটা স্থায়ী, ক্রেতারা কী দামে কিনতে আগ্রহী এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় কত হবে এসব বিষয় যাচাই না করে বড় পরিসরে চাষে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাসুদ রানা জানান, উপজেলায় সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে কালো ধান চাষ হচ্ছে। ভালো ফলন নিশ্চিত করতে কৃষক সাইমন মোল্লাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের কুমিল্লা, নওগাঁ, চট্টগ্রাম ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় কালো ধান চাষের খবর পাওয়া যায়। তবে প্রচলিত ধানের তুলনায় দেশে এই জাতের আবাদ এখনও সীমিত। বিভিন্ন এলাকার চাষের অভিজ্ঞতা থেকে উপযুক্ত জাত নির্বাচন, জমি ব্যবস্থাপনা, পরিচর্যা এবং উৎপাদন খরচ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কৃষি খাতে নতুন জাতের ফসলের পরীক্ষামূলক আবাদ কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে বের করার একটি উপায়। কালো ধানের ক্ষেত্রে ভালো ফলনের পাশাপাশি মানসম্মত বীজের সহজলভ্যতা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে বিক্রির সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আখাউড়ার কৃষক সাইমন মোল্লার এই উদ্যোগের ফলাফল স্থানীয় অন্য কৃষকদের জন্যও শিক্ষণীয় হতে পারে। তাঁর জমিতে প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া গেলে এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে এ জাতের ধান চাষে আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে কালো ধানকে লাভজনক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুধু উচ্চ বাজারদর নয়, বরং বাস্তব উৎপাদন ব্যয়, প্রতি বিঘায় ফলন, ক্রেতার চাহিদা ও বিক্রির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব দিক ইতিবাচক হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষিতে কালো ধান নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

