টঙ্গীতে গ্যাস বিস্ফোরণে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু, আইসিইউতে মেয়ে

গাজীপুরের টঙ্গীতে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ থেকে লিকেজের কারণে সৃষ্ট বিস্ফোরণে দগ্ধ এক দম্পতির মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাতে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরা মারা যান। একই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ তাঁদের ১৬ বছর বয়সী মেয়ে তানিশা আক্তার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে।

নিহত দম্পতি হলেন লাল চান (৬০) ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা বেগম (৫০)। তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার কুড়িপাড়া এলাকায়। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা পরিবার নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের মুদাফা এলাকায় মাস্টারবাড়িসংলগ্ন একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সুলতান মাহমুদ শিকদার জানান, আগুনে লাল চানের শরীরের ৯৫ শতাংশ, নাসিমা বেগমের ৮৫ শতাংশ এবং তাঁদের মেয়ে তানিশার ৮৬ শতাংশ পুড়ে যায়। তাঁদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান স্বামী ও স্ত্রী। মেয়েটির অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত পাইপে লিকেজ থাকায় রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। বুধবার সকাল সাতটার দিকে নাসিমা বেগম রান্না করার জন্য চুলা জ্বালালে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের তিন সদস্য দগ্ধ হন।

তাঁদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে প্রতিবেশীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে দগ্ধ তিনজনকে উদ্ধার করেন। তাঁদের দ্রুত ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতেই লাল চান ও নাসিমার মৃত্যু হয়।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহত স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সংযোগে ত্রুটি দেখা দিলে ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে রান্নাঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকলে গ্যাস বের হওয়ার পর তা সহজে ছড়িয়ে যেতে বা বাইরে বের হতে পারে না। এ অবস্থায় আগুনের শিখা, বৈদ্যুতিক সুইচের স্ফুলিঙ্গ কিংবা অন্য কোনো আগুনের উৎসের সংস্পর্শে গ্যাস জ্বলে উঠতে পারে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সিলিন্ডারের পাইপ, রেগুলেটর ও চুলার সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। পাইপে ফাটল, শক্ত হয়ে যাওয়া, ঢিলা সংযোগ কিংবা অন্য কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সেটি দ্রুত পরিবর্তন বা মেরামত করতে হবে। গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে কোনোভাবেই দিয়াশলাই, লাইটার কিংবা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার করা উচিত নয়। নিরাপদ হলে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে।

গ্যাস লিকেজের সন্দেহ হলে আগুন জ্বালিয়ে পরীক্ষা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে নিজে ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে জরুরি সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। সিলিন্ডার স্থাপনের স্থানেও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা উচিত।

বাসাবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মৌলিক নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। বিশেষ করে চুলা জ্বালানোর আগে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, সংযোগ ঠিক আছে কি না এবং রান্নাঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খেয়াল রাখা উচিত।

গ্যাসের পাইপ ও রেগুলেটরের মান এবং মেয়াদ সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাহ্যিকভাবে ঠিক মনে হলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর সংযোগ পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।

টঙ্গীর এ ঘটনায় একটি পরিবারের দুই সদস্যের মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁদের কিশোরী মেয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনাটি রান্নার গ্যাস ব্যবহারের সময় সতর্কতা ও নিয়মিত যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

Related Posts

About The Author