সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সরকারের ভূমিকা নিয়ে সিপিবির প্রশ্ন

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। প্রবাসীদের জীবন, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে বিদেশে কারাবন্দী বাংলাদেশিদের মুক্তির উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এসব দাবি তুলে ধরেন সিপিবির নেতারা। সমাবেশ শেষে তাঁরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

সমাবেশে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আদালতের রায় সম্পর্কে বাংলাদেশের সরকারের বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কিছু জানা ছিল না বলে জানানো হয়েছে।

আবদুল্লাহ ক্বাফী বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকেরা গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সরকারকে সচেতন ও সক্রিয় থাকতে হবে। তাঁর অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের জীবন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যও করা হয়েছে বলে তিনি প্রতিবাদ জানান।

প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান তুলে ধরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অথচ তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রবাসীদের উপার্জনে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হলেও তাঁদের বিপদের সময়ে যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বিদেশে বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা, আইনি সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগীব আহসান মুন্না। তিনি বিদেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়া, নিয়মিত কারাগার পরিদর্শন এবং বন্দীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান।

রাগীব আহসান বলেন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কারাবন্দী বাংলাদেশিদের মুক্তির বিষয়ে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে আটক নাগরিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ফজলুর রহমান। কর্মসূচি পরিচালনা করেন সিপিবির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন।

সমাবেশে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, মামলার অগ্রগতি এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাসের তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্দী ব্যক্তি প্রয়োজনীয় আইনজীবীর সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে সময়মতো আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান রেখেই একজন বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো মামলায় সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, মামলার পর্যায় এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার ওপর।

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষা এবং ঋণ পরিশোধের জন্য উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের কেউ গুরুতর আইনি সমস্যায় পড়লে পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়তে পারেন। এ কারণে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহল।

এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দূতাবাসের মাধ্যমে আইনি পরামর্শ, বন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া এবং জরুরি ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তথ্য যাচাই ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সিপিবির নেতারা তাঁদের বক্তব্যে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা, বিদেশে কারাবন্দীদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের দাবি, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সংকটের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি বিদেশে আটক নাগরিকদের সুরক্ষা ও মুক্তির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

Related Posts

About The Author